শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬
বিশ্ব ডাক দিবস আজ

ডাক বিভাগের সেবা বাড়লেও কমছে না ব্যয়-আয়ের ফারাক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০২৬, ১১:৩২ এএম

ডাক বিভাগের সেবা বাড়লেও কমছে না ব্যয়-আয়ের ফারাক

একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টাই ছিল বহু পরিবারের কাছে প্রতীক্ষার শব্দ। দূর শহর কিংবা প্রবাস থেকে আসা একটি খামের জন্য যেন থেমে থাকত বিকেল। কখনও কেটে যেত দিনের পর দিন। হলুদ খামের ভাঁজ খুললেই দূরত্ব মুছে যেত। চোখে ভাসত প্রিয় মানুষের মুখ। ভালোবাসার কথা, কখনও অভিমানের নীরবতা অথবা বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস যেন মিশে থাকত কাগজে লেখা অক্ষরে।

এখন সেই দৃশ্য শুধুই স্মৃতি। মোবাইল ফোনের পর্দায় মুহূর্তেই পৌঁছে যায় খবর, ছবি কিংবা ভালোবাসার বার্তা। ব্যক্তিগত চিঠির সঙ্গে ডাক বিভাগ হারিয়েছে তার ঐতিহ্য। একের পর এক নতুন সেবা চালু করেও আর্থিক ঘাটতি কাটাতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। চিঠির জায়গা নিয়েছে সরকারি নথি, আদালতের কাগজপত্র, পাসপোর্ট, ভূমির রেকর্ড, পার্সেল ও ই-কমার্সের পণ্য। তবে নতুন নতুন সেবা বাড়লেও আয়-ব্যয়ের বড় ফারাক রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডাক দিবস।

 

দেশে প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬০০টি সরাসরি পরিচালনা করে ডাক বিভাগ। বাকিগুলো এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি ও অন্যান্য চিঠিপত্র মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ ডাক পরিবহন করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ১০ লাখে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ হয়েছে।

ডাকপত্রের সংখ্যা বাড়লেও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের বড় ফারাক। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডাক বিভাগের আয় ছিল প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ২৫৩ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৩৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তিন বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা। তবে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা।
বছরে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ। পেনশন ও আনুতোষিকে ব্যয় হয় ২৬০ কোটির বেশি। সব মিলিয়ে মোট বাজেটের প্রায় ৯৩ শতাংশ চলে যায় বেতন, পেনশন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে। ফলে আয় বাড়লেও ব্যয়-আয়ের বড় ফারাক থেকেই যাচ্ছে।

 

চিঠির বদলে পার্সেল

ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ার পর ডাক বিভাগ আয় বাড়াতে সেবার ধরন বদলানোর চেষ্টা করছে। ২০১৯ সালে চালু হওয়া ‘নগদ’ থেকে ডাক বিভাগ আগে বছরে গড়ে ১৩-১৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেত। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১৮ কোটি টাকা। পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ভূমির খতিয়ান বা পরচা বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সেবাও চালু হয়েছে। এ পর্যন্ত ৭ লাখের বেশি ভূমি রেকর্ড গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও নতুন সেবার তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশে ও বিদেশে থাকা ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন এ সুবিধা নিয়েছেন। এর বাইরে পণ্য পরিবহনে স্পিড পোস্ট চালু করা হয়েছে। চলতি বছর মার্চে চালুর পর এ পর্যন্ত প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পার্সেল সেবাতেও ব্যবহার বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ২৪৩ টন পণ্য পাঠানো হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৩১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় বাজারেও পণ্য পরিবহনে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

 

বেসরকারি কুরিয়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা

বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ডেলিভারি, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অবস্থান শনাক্তকরণ এবং ঘরে বসে পণ্য নেওয়া-দেওয়ার সুবিধা দিচ্ছে। তবে ডাক বিভাগের অনেক কার্যক্রম এখনও পুরোনো অবকাঠামো ও জনবল সংকটের মধ্যে চলছে।

বিশেষ করে পচনশীল পণ্য পরিবহনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় দেরি হলে ফলসহ পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতিও রয়েছে।

 

ফ্র্যাঞ্চাইজিতে নতুন চেষ্টা

খরচ কমানো ও সেবা বাড়াতে গত ২৯ জুলাই চালু করা হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস ও পোস্ট পিকআপ পয়েন্ট। শুরুতে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনাসহ ১২টি অঞ্চলে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

চুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে চিঠি ও পার্সেল সংগ্রহ এবং বিতরণ করতে পারবে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী এসব কেন্দ্র সরকারি ডাকঘরের চেয়ে বেশি সময় খোলা রাখার সুযোগ থাকবে। 

 

ডাক দিবসের কর্মসূচি

এ বছরের বিশ্ব ডাক দিবসের প্রতিপাদ্য– ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’। বাংলাদেশে ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর পালিত হবে ডাক সপ্তাহ। শুক্র ও শনিবার সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম ছাড়া সব ডাকঘরের সেবা চালু থাকবে। এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি উৎসব, ডাকটিকিট প্রদর্শনী ও ডাকমেলার আয়োজন করা হয়েছে।

বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘ডাক বিভাগ এখন আর শুধু প্রথাগত চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়। বরং এটি একটি আধুনিক ও বহুমুখী সেবা নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। জনগণের আস্থা অর্জনই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!