খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প ঘিরে বিতর্কের মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. রেজাউল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার দুপুরে খুলনা ওয়াসা ভবনে তাঁর কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করেন দুদকের কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুদক ও ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের (ফেজ-২) প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই রেজাউল ইসলামকে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি প্রকল্পটির দায়িত্ব পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী মহলকে প্রায় ৯৪ কোটি টাকার খালি চেক দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।
দুদকের খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, রেজাউল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ও অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত নথিপত্র পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্তাধীন।
এর আগে খুলনা ওয়াসার গ্রাহকদের জন্য ৫ হাজার গৃহসংযোগে পাইপ ও ফিটিংস স্থাপনের কাজের চূড়ান্ত বিলের নথিতে একই সংযোগের বিপরীতে দ্বিতীয়বার বিল জমা দেওয়ার অভিযোগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর রেজাউল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে তাঁর জবাব দেওয়ার কথা রয়েছে।
ফেজ-২ প্রকল্পের পিডির রুটিন দায়িত্ব পাওয়া নিয়েও আগে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালকের পদটি চতুর্থ গ্রেডের হলেও রেজাউল ইসলাম ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা। গত ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের এক আদেশে তাঁকে প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এদিকে সম্প্রতি চারটি চেকের ফটোকপি ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ফটোকপিতে সাউথইস্ট ব্যাংকের খুলনা শাখার একটি হিসাব থেকে ২৪ কোটি টাকা করে দুটি এবং ২৩ কোটি টাকা করে আরও দুটি চেক প্রস্তুতের তথ্য দেখা যায়। চারটি চেকের মোট অর্থের পরিমাণ ৯৪ কোটি টাকা। ফটোকপিতে গ্রহণকারী হিসেবে ‘মো. নাহিদুল ইসলাম’ নামের একজনের স্বাক্ষরও দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
খুলনা ওয়াসার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, চেকগুলোর স্বাক্ষর রেজাউল ইসলামের। তবে চেকগুলোর হিসাবের মালিকানা, স্বাক্ষরের সত্যতা কিংবা লেনদেনের উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলও জানা যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সঠিক নয়। শোকজের জবাবও আমি দেব।
চেকের ফটোকপি ও হিসাবের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো আমি জানি না। এসব বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আমি কিছুই জানি না।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, এটি একটি অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের বিষয়। ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে চেক বা হিসাবের মালিক কে, তা বের করতে হবে। কেউ জড়িত না থাকলে তদন্তে সেটিও পরিষ্কার হওয়া উচিত, আর জড়িত থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, অতীতেও ওই প্রকৌশলীকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। বিতর্কিত ব্যক্তিকে বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলে খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
