সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

সুন্দরবনের জলজ সম্পদে বিষের ছোবল, থামছে না মাছ শিকার

খুলনা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম

সুন্দরবনের জলজ সম্পদে বিষের ছোবল, থামছে না মাছ শিকার

 সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগ থামছে না। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানে জেলে আটক, বিষ ও নিষিদ্ধ জাল জব্দ এবং মামলা হলেও বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতি এবং দীর্ঘ মেয়াদে সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে বিষাক্ত মাছ খাওয়ার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের আওতাধীন মার্কি খালে অভিযান চালিয়ে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে চার জেলেকে আটক করা হয়। তাঁরা হলেন রফিকুল ইসলাম (৫২), আয়ুব আলী গাজী (৫৫), দিদারুল গাজী (৩০) ও হামিদ গাজী। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে বিষ প্রয়োগ করে ধরা ৮০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়।

এরপর ১৪ অক্টোবর পশ্চিম সুন্দরবনের ভোমরখালী অভয়ারণ্য এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও চার জেলেকে আটক করে বন বিভাগ। তাঁরা হলেন কয়রার ৫ নম্বর কয়রা গ্রামের আবুল বাসার গাজী (৩৫), মো. হাবিবুল্লাহ হোসেন (৩০), রবিউল ইসলাম (৩৫) ও হামিদ সানা (৪৫)। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে চার বোতল বিষ, নিষিদ্ধ ভেসালি ও ঘন ফাঁসের চরপাতা জাল, একটি ডিঙি নৌকা, দা, কুড়াল এবং প্রায় ২০০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগে ৩৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৭ জনকে। তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৫ জন। এ সময়ে ৫৯টি বিষের বোতল, বিষ প্রয়োগ করে ধরা ১৬৭ কেজি চিংড়ি ও ১০০ কেজি অন্যান্য মাছ জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ৮৯টি নৌকা ও ৭০টি অবৈধ মাছ ধরার জাল জব্দ করেছে বন বিভাগ।

সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের বিভিন্ন নদী-খালে ‘রিপকর্ড’ নামের একটি কীটনাশক প্রয়োগ করে চিংড়ি শিকারের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘন ফাঁসের চরপাতা ও নিষিদ্ধ ভেসালি জাল দিয়ে নির্বিচারে ছোট মাছ ধরার অভিযোগও পাওয়া গেছে। ছিচখালি, বুন্দ, কেওড়াসুতি, হংসরাজ, দুধমুখ, দোবেকি, পাটকোষ্টা, চালকি, মার্কি, আন্দারমানিক, শাপখালি, বাটলু, নোটাবেকি ও কাটেশ্বর এলাকার নদী-খালে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পশুর নদী, জয়মনি, কচিখালি, হড্ডা, মার্কি, নীলকমল, শাপখালি, বজবজা, আন্দারমানিক ও খাসিটানা এলাকাতেও বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ও ফরেস্ট রেঞ্জার আলামিন হোসেন বলেন, অভিযানে বিষ, নিষিদ্ধ জাল ও মাছ শিকারে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাসানুর রহমান বলেন, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে এ ধরনের অভিযোগে ৩৪টি মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের কারণে সুন্দরবনের কী ক্ষতি হচ্ছে এবং ওই মাছ খেলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে জেলেদের সচেতন করতে কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরলে শুধু লক্ষ্যবস্তু মাছ নয়, অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষাক্ত পদার্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়লে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দূষিত মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

তবে সুন্দরবনে ব্যবহৃত বিষের রাসায়নিক উপাদান, পানিতে এর স্থায়িত্ব এবং জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সুন্দরবনের নদী-খালের মাছের ওপর উপকূলের বহু জেলের জীবিকা নির্ভরশীল। ফলে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে তা মৎস্যসম্পদের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি জব্দ করা বিষের রাসায়নিক পরীক্ষা, জলজ পরিবেশের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
 

জেএইচ

Link copied!