সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
মানসম্মত উচ্চশিক্ষা

চাই টেকসই রূপরেখা ও কার্যপদ্ধতি

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

চাই টেকসই রূপরেখা ও কার্যপদ্ধতি

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পরিধি গত কয়েক দশকে অভাবনীয়ভাবে প্রসারিত হয়েছে। একসময় দেশের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত আসনের ওপর নির্ভর করতে হতো। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম কিংবা কয়েকটি বড় শহর ছাড়া দেশের প্রান্তিক জেলাগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসম্মত পড়াশোনার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। দেশের আনাচে-কানাচে বিস্তৃত হয়েছে উচ্চশিক্ষার পরিসর। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৮। এর সঙ্গে নতুন করে আরও ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন জমা পড়েছে ইউজিসিতে। এসব প্রস্তাবিত আবেদন যদি অনুমোদন পায়, তবে দেশে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৮৯। উচ্চশিক্ষায় অবকাঠামোগত বিস্তার এবং আঞ্চলিক সমতা তৈরির ক্ষেত্রে এই সংখ্যাগত পরিবর্তনকে নিঃসন্দেহে একটি রূপান্তরকারী পদক্ষেপ বা বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির এই উল্লম্ফনের সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার প্রশ্নটি। উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন প্রতিষ্ঠানের নামফলক উন্মোচন কিংবা শিক্ষার্থীদের হাতে ডিগ্রি সনদ তুলে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সার্থকতা লুকিয়ে থাকে মানসম্মত শিক্ষাদান, মৌলিক ও প্রয়োগমুখী গবেষণা পরিচালনা, যুগোপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের বাজার তৈরি করার ওপর। উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের দেশে ইতোমধ্যে পরিচালিত অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকছে। শিক্ষার্থীরা সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এই যখন বাস্তবতা, তখন নতুন নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে নীতিবিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মনে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আগে অন্ধভাবে এগিয়ে না গিয়ে সামগ্রিক বাস্তবতা মূল্যায়নের যে উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গ্রহণ করেছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। ইউজিসি জানিয়েছে, নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে কেবল প্রতিষ্ঠানের জমি, আর্থিক সক্ষমতা বা অবকাঠামো দেখেই অনুমতি দেওয়া হবে না। বরং যে এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে উচ্চশিক্ষার আঞ্চলিক শিক্ষার্থী চাহিদা কতটা, প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর বাস্তব কর্মসংস্থান বা অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে কি না এবং পর্যাপ্ত মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের টেকসই পরিকল্পনা রয়েছে কিনা- এসব সূচক নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের অভিমত, অঞ্চলভিত্তিক সঠিক পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় গবেষণাগার ও আধুনিক পাঠ্যক্রম ছাড়া নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান শুরু করলে তা কেবল বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হবে।

শিক্ষা খাতে সংখ্যাগত পরিবর্তনের চেয়ে গুণগত অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মূল বক্তব্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে উচ্চশিক্ষার প্রবৃদ্ধি মাপা একটি ভ্রান্ত ধারণা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হলো, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো স্নাতকরা বিশ্বায়নের এই প্রতিযোগিতামূলক যুগে কর্মক্ষেত্রে কতটা সাফল্য অর্জন করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে উদ্ভাবনী গবেষণা কেমন হচ্ছে এবং শিক্ষকরা পাঠদানে কতটা যোগ্য ও আন্তর্জাতীয় মানের। স্থানীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দেওয়াই হওয়া উচিত যেকোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান অঙ্গীকার।

সারসংক্ষেপ করলে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো- উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি গুণগত মানের সুনিশ্চিত উত্তরণ ঘটানো। খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা বা ঝিনাইদহের প্রস্তাবিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি আঞ্চলিক চাহিদা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং শিল্প-কারখানার সঙ্গে কার্যকর মেলবন্ধন তৈরি করতে পারে, তবেই তা জাতির জন্য আশীর্বাদ হবে। সংখ্যার নতুন মাইলফলক তখনই সার্থক ও অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে, যখন তার সঙ্গে সঙ্গে আমরা উচ্চশিক্ষার মানের ক্ষেত্রেও একটি অনন্য ও যুগান্তকারী মাইলফলক স্থাপন করতে সক্ষম হব।

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!