শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬

জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বিপ্লব ও সংহতি দিবস

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ০৯:২৭ এএম

জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বিপ্লব ও সংহতি দিবস

 


আজ ৭ নভেম্বর, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন—‘মহান বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের সিপাহি-জনতা রাজপথে নেমে এসে এক সংকটময় ও জটিল রাজনৈতিক অচলায়তনের অবসান ঘটিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল আধিপত্যবাদ, আগ্রাসন এবং অভ্যন্তরীণ চক্রান্তের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক প্রতিরোধ। আর এই ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে দেশ ও জাতির হাল ধরেছিলেন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আজকের এই দিনে শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম এবং তাঁর অসামান্য নেতৃত্বের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা গোটা জাতির নৈতিক দায়িত্ব।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের আকস্মিক ও মর্মান্তিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ এক গভীর অনিশ্চয়তা ও সাংবিধানিক শূন্যতার মধ্যে পড়েছিল। ৩ নভেম্বর কুচক্রী মহলের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ৭ নভেম্বর সিপাহি ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের ভাগ্যাকাশ থেকে অপশক্তির কালো মেঘ কেটে যায়। এই গণজাগরণ কোনো ব্যক্তিবিশেষের উচ্চাভিলাষের ফল ছিল না, বরং তা ছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার এক ঐতিহাসিক জাতীয় আকুতি। এই সংকটময় মুহূর্তে সিপাহি-জনতার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েই জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন এবং দেশের স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা রক্ষায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
শহীদ জিয়াউর রহমান কেবল একটি সংকটের উত্তরণ ঘটিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি বাংলাদেশকে একটি নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। তৎকালীন সময়ে জাতি যখন দলীয় কোন্দল ও পরিচয়ের সংকটে জর্জরিত, তখন তিনি দেশের সকল নাগরিককে এক সুতোয় বাঁধতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্লোগান নিয়ে আসেন। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, বরং এটি ছিল দেশের প্রতিটি নাগরিকের মনে নিজস্ব স্বত্বা ও দেশপ্রেমের বীজ বপন করার একটি মোক্ষম উপায়। তাঁর এই দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল ধর্মীয় সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের প্রতি অবিচল আনুগত্য।
অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রেও শহীদ জিয়ার অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয় যখন সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ঘটেছিল, যা দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন গতিশীলতা এনে দেয়। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এছাড়া, তাঁর আমলে খাল খনন কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিল। কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে তিনি যে রূপরেখা তৈরি করেছিলেন, তা আজও দেশের কৃষি খাতের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একাধারে দক্ষ সামরিক কমান্ডার, সফল রাষ্ট্রনায়ক এবং আপসহীন দেশপ্রেমিক। তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবন ছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণে উৎসর্গীকৃত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে দেশের উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট দলের বা গোষ্ঠীর নয়, বরং তা হতে হবে সর্বজনীন ও জনমুখী। তাঁর সততা, কর্মনিষ্ঠা এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা কাজ করার অদম্য মানসিকতা আজও আমাদের রাজনীতিতে এক অনন্য নজির হয়ে আছে। তিনি সবসময় দেশের স্বার্থকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।
আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা বিগত ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তখন শহীদ জিয়ার অবদান আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বর্তমান বিশ্ব ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ আজও আমাদের পথপ্রদর্শক। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে এবং জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে শহীদ জিয়ার জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নেওয়া অপরিহার্য।
৭ নভেম্বর আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে জাতীয় সংকটের মুহূর্তে দলমত নির্বিশেষে এক হয়ে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে হয়। এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের শপথ হোক—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে বুকে ধারণ করে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা। মহান এই বিপ্লব ও সংহতি দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেই দূরদর্শী নেতাকে, যিনি তমসাবৃত দেশকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আত্মত্যাগ ও অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!