জলবায়ু পরিবর্তনকে দীর্ঘদিন পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখা হলেও এর প্রভাব এখন অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, কর্মসংস্থান ও জনস্বাস্থ্যের প্রতিটি স্তরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় শ্রমিকের কর্মক্ষমতা কমছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়ছে লবণাক্ততা এবং বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অবকাঠামো। ফলে পরিবেশ সুরক্ষা এখন আর কেবল প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত।
১৫ অক্টোবর ২০২৬ রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জলবায়ু ঝুঁকির এই বাস্তব চিত্র। অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় অর্থনীতিকে আরও সহনশীল করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
পরিবেশগত ক্ষতি যখন অর্থনৈতিক বোঝা:
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে পরিবেশদূষণ একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের Bangladesh Country Environmental Analysis অনুযায়ী, বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও সিসার সংস্পর্শের কারণে দেশে বছরে ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু ঘটে এবং বিপুলসংখ্যক অসুস্থতার দিন তৈরি হয়। ২০১৯ সালের হিসাবে এসব পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকির অর্থনৈতিক ও কল্যাণগত ক্ষতি ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমতুল্য।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য গভীর। দূষণের কারণে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, শ্রমের উৎপাদনশীলতা কমে এবং পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়। একই সঙ্গে দূষিত নদী ও জলাশয় কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ পরিবেশের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ও ভোগ—অর্থনীতির উভয় দিকেই চাপ সৃষ্টি করে।
তাপপ্রবাহের প্রভাবও ক্রমেই গুরুতর হচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক ও কারখানার কর্মীদের কাজের সক্ষমতা কমে যায়। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হলে বাড়ে উৎপাদন ব্যয়; আর সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণেও অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই পরোক্ষ ব্যয় অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করে।
কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানে বাড়ছে ঝুঁকি:
বাংলাদেশের কৃষি এখনো আবহাওয়ার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে ফসলের উৎপাদন ও কৃষকের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ততার বিস্তার জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে।
কৃষির ক্ষতি শুধু কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন কমলে খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হয়, বাজারে দামের অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহেও সমস্যা দেখা দেয়। ফলে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করা মানে একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।
শিল্প খাতেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তীব্র গরমে শ্রমিকের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি শীতলীকরণ ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে পারে। বন্যা বা অতিবৃষ্টিতে সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি, সরবরাহব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, দক্ষ কর্মী, কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং পরিচ্ছন্ন উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।
সবুজ অর্থনীতিতে রয়েছে নতুন সম্ভাবনা:
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি বাংলাদেশ পরিচ্ছন্ন ও সবুজ অর্থনীতির মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রযুক্তি এবং টেকসই কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে একদিকে দূষণ কমবে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর রাখা, নির্গমন পর্যবেক্ষণ, পানি ও জ্বালানির অপচয় কমানো এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি। পরিবেশগত নিয়ম মেনে চলাকে শুধু অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে বিবেচনা না করে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারি নীতিসহায়তা, সহজ অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়া গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশগত মানও উন্নত হতে পারে।
নগর ব্যবস্থাপনাতেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা রক্ষা, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা শহরের পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে পারে। এগুলোকে কেবল নাগরিক সুবিধা নয়, বরং অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।
জলবায়ু অর্থায়ন: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন:
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য অর্থায়ন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অভিযোজন, উপকূলীয় সুরক্ষা, নিরাপদ পানি, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং কৃষির সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত না হলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
বণিক বার্তার গ্রিন ডায়ালগে এডিবির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টরের বক্তব্যে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ অর্থায়নকে কার্যকর করতে হলে শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, বরং অর্থপ্রাপ্তির শর্ত, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং বিনিয়োগের ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজপ্রাপ্য, অনুদানভিত্তিক অথবা স্বল্পসুদের অর্থায়ন আদায়ে জোরালো অবস্থান নেওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর অভিঘাত মোকাবিলায় ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বেশি। তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে ন্যায্যতা, দায়বদ্ধতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একই সঙ্গে প্রকল্প নির্বাচন ও অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোন প্রকল্পে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার মাধ্যমে কত মানুষ উপকৃত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা কমছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে অর্থায়নের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
কপ–৩১-এ বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত:
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ–৩১) বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ। সেখানে জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অভিযোজন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশের অবস্থান তুলে ধরলেই চলবে না; বরং অর্থায়ন ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে কার্যকর অভিযোজন নিশ্চিত করা যায়, তার বাস্তবসম্মত প্রস্তাবও দিতে হবে। উপকূলীয় সুরক্ষা, কৃষির অভিযোজন, আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা, নিরাপদ পানির সরবরাহ এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জোরালো করা জরুরি।
দেশের অভ্যন্তরেও উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলকভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত ক্ষতি, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক লোকসান এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য:
পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশের ক্ষতি উপেক্ষা করে অর্জিত প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না। দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, দুর্যোগ এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসের কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি হয়, তা শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের সুফলকে সীমিত করে দেয়।
বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বিমুখী দায়িত্ব রয়েছে—একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, অন্যদিকে সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে পরিবেশগতভাবে নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল করে তোলা। এ জন্য সরকারের নীতি, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নাগরিক সচেতনতার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, পরিবেশ সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষার অপরিহার্য বিনিয়োগ। জলবায়ু সংকটের এই সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলকে এমন পথে এগোতে হবে, যেখানে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রকৃতি ও মানুষের নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন থাকবে। পরিবেশকে সুরক্ষিত রেখেই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বিচক্ষণ উন্নয়ননীতি।
লেখক : আমিনুর রসুল, গবেষক, জলবায়ু ও পরিবেশবিদ।
কামাল পারভেজ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
