শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
অর্থনীতিতে টানাপড়েন

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না। দৈনন্দিন অপরিহার্য চাহিদা মেটাতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে।
বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষ সীমাহীন দুর্দশা-দুর্ভোগে পড়েছে। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের খাতায় প্রতিদিন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক সংকটকেই সামনে আনে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও দেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগের কথাই শুনিয়েছে।
পত্রিকার খবরে বলা হয়, বিশ্বব্যাংকের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) দেশের অর্থনীতি নিয়ে দুঃসংবাদ দিয়েছে।

আইএমএফ জানিয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২ শতাংশে নামতে পারে। আবার অন্যদিকে একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এর আগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস ছিল ৪ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, এই তিন সংস্থার মধ্যে আইএমএফের পূর্বাভাসেই প্রবৃদ্ধি কম ধরা হয়েছে।

অস্বীকার করার সুযোগ নেই, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতার কারণে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক প্রভাব আরো বেশি।
এদিকে উচ্চ সুদের হার, ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতার কারণে বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসছে না। ফলে শিল্পের উৎকদন সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে রপ্তানি খাতেও। এ ছাড়া রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করাও বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবেলার প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানাপড়েন থাকলেও আমাদের অর্থনীতির সক্ষমতাও রয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাস আয়, কৃষি, অভ্যন্তরীণ বাজার ও তরুণ শ্রমশক্তি অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে অর্থনীতিতে সুবাতাস আনতে জ্বালানিসংকট, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা ও রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া আইএমএফের প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগকে সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, প্রত্যাশিত সুফল না এলে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। চলমান বাস্তবতায় আরো যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো, অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি না ফিরলে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কেননা আইএমএফের প্রতিবেদনে প্রতিবেশী ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ এবং ভুটানের ৬.৯ শতাংশ ধরা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আইএমএফের পূর্বাভাসকে অনিবার্য পরিণতি হিসেবে না দেখে অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবেলার সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া উচিত। শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রায় পৌঁছাতে হবে। স্বল্প মেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘ মেয়াদে উৎকদনশীল বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।

আমরা মনে করি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগপ্রবাহ বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা একান্ত অপরিহার্য। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোতে সরকারকে অগ্রগাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণে সক্ষমতা বাড়ানোতে গুরুত্ব দিতে হবে।
 

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!