বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
জরুরি পদক্ষেপ নিন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে সংকটে শ্রমবাজার

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে সংকটে শ্রমবাজার

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। গত শনিবার সৌদি আরবের বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২৪ জন।
আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলার জেরে ঢাকা-রিয়াদ আকাশপথ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিপাকে পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী হাজারো শ্রমিক। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হলো, এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যার সরাসরি ধাক্কা লাগতে পারে দেশের অর্থনীতিতেও।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা দেখে আসছি, করোনাভাইরাস মহামারির পর বিশ্বে স্থিতিশীলতা আসেনি। মহামারি শেষ হতে না হতেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের মধ্যেই হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গোটা অঞ্চলেই সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। জ্বালানি খাত অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশে সেই সংকট আরো প্রকট হয়। সর্বশেষ সৌদি ও হুতিদের মধ্যে সংঘাতের কারণে বাংলাদেশিদের প্রাণ পর্যন্ত গেল। জানা গেছে, ওই দিনের হামলায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি, আর তিন শতাধিক আহতের মধ্যে ২৪ জন বাংলাদেশি।

পত্রিকার খবরে বলা হয়, গত এক দশকের মধ্যে গত শনিবারের হামলাটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
এ ছাড়া গত রবিবার হামলায় রিয়াদে বিমানবন্দরে আগুন ধরে যায়। এতে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এদিকে গত শনিবার থেকেই ঢাকা-রিয়াদ আকাশপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। খবরে বলা হয়েছে, ঢাকা থেকে রিয়াদগামী অন্তত সাতটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন হাজার প্রবাসী কর্মী চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তিতে পড়েন। অন্যদিকে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিয়েও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিবছর লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তবে তাঁদের বেশির ভাগের গন্তব্যই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। বিশেষ করে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। গত বছর সাড়ে সাত লাখের বেশি শ্রমিক সৌদি আরবে গেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। সংগত কারণেই সৌদি আরবে যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও পড়বে। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাজারে পাঠাতে আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব এবং খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহও আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়ে গেলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী যথার্থই বলেছেন, ‘এই সংকটকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি হিসেবে দেখলে চলবে না, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।’

আমরা মনে করি, চলমান সহিংস পরিস্থিতির দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও বিকল্প শ্রমবাজার সন্ধান করতে হবে। এ জন্য দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলায় বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। জ্বালানি উৎসর জন্যও মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমাতে হবে।

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!