পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থার এক নির্মম বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যেখানে বাজারে মাত্র এক টাকায় মিলছে চারটি লাউ, সেখানে যেন শায়েস্তা খানের আমলকেও হার মানিয়েছে। তবে শায়েস্তা খানের আমলে পণ্যের আতিশয্যের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনে স্বস্তি ছিল; কিন্তু আজকের আটোয়ারীতে কৃষকের জীবনে নেমে এসেছে চরম হাহাকার ও হতাশা। এক কেজি মোটা চাল কিনতে কৃষককে ২০০টি লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে, আর ৭৫০ টাকা দরের এক কেজি গরুর মাংস কেনা তাদের কাছে ৩ হাজার লাউ বিক্রির সমান স্বপ্নের মতো।
৪০ শতক জমিতে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে যে চাষি দিনরাত ঘাম ঝরিয়ে মাত্র ৩ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করতে পেরেছেন, তার মনের ক্ষোভ ও কান্না বর্ণনা করার ভাষা আমাদের জানা নেই। ফসল ঘরে তুলে লাভ করা তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ ও পরিচর্যার মজুরিটুকুও যখন উঠছে না, তখন উপার্জনের মাধ্যম নিজের হাতে ধ্বংস করা ছাড়া কৃষকের সামনে যেন আর কোনো পথ থাকছে না। নিজের প্রিয় বাগান কেটে ফেলা কিংবা উৎপাদিত সবজি গরুকে খাওয়ানোর মতো মর্মান্তিক দৃশ্য কেবল এক অঞ্চলের ঘটনা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক কৃষিব্যবস্থার এক গভীর সংকটের সংকেত।
এই চরম দুর্দশার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো কৃষক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং বাজারব্যবস্থার চরম নৈরাজ্য। মাঠপর্যায়ে কৃষক যেখানে ৪টি লাউ বিক্রি করছেন এক টাকায়, কিংবা সর্বোচ্চ ১ থেকে ৫ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেখানে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের স্থানীয় খুচরা বাজারে সাধারণ ভোক্তাকে প্রতি পিস লাউ কিনতে হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। কৃষকের এই চরম লোকসান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অসংগত লাভ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আমাদের দেশের বাজারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এখন আর নীতি-নৈতিকতা বা সাধারণ সরবরাহের নিয়মে চলছে না; তা সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে বন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি অনুযায়ী উৎপাদন প্রচুর হয়েছে- এ কথা সত্য হতে পারে। কিন্তু শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই কি কৃষি বিভাগের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? যখন এক অঞ্চলের কৃষক উৎপাদিত পণ্যের বাজারি সংযোগ বা সঠিক বিপণন ব্যবস্থার অভাবে নিঃস্ব হচ্ছেন, তখন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের নীরবতা কিংবা যোগাযোগে অনুপস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দেয়। সংকটের মুহূর্তে কৃষি বিভাগের এ ধরনের উদাসীনতা কৃষকদের আরও বেশি অসহায় করে তোলে। কৃষক থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দামের যে বিশাল ব্যবধান, তা কমাতে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে কঠোর মনিটরিং চালাতে হবে। দেশের যেসব অঞ্চলে লাউ বা অন্যান্য সবজির চাহিদা ও দর বেশি, সেখানে আটোয়ারীর মতো উদ্বৃত্ত অঞ্চলের ফসল পরিবহনের জন্য সরকারি বা সমন্বিত উদ্যোগে বিশেষ পরিবহন চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। মৌসুমি শাকসবজি দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং পচন রোধে স্থানীয় পর্যায়ে হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা যেমন প্রয়োজন, তেমনই কৃষকের বিপদে তদারকি করা এবং তাৎক্ষণিক সমাধান খোঁজার ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষি অফিসের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে- এ নীতি কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করে কৃষক যদি প্রতিবার চরম লোকসানের মুখে পড়েন, তবে তারা কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। আর তার পরিণতি হবে পুরো জাতির খাদ্যনিরাপত্তার ওপর এক মারাত্মক হুমকি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো দাবি, অবিলম্বে আটোয়ারীর লাউচাষিদের এই সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া হোক এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত বিপণন নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হোক।
