দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ট্রেন এখনও অন্যতম সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয় মাধ্যম হলেও যাত্রীদের ভোগান্তি কমার কোনো লক্ষণ নেই। সরকারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া ট্রেনগুলোতেও সেবার মানের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। সময়মতো ট্রেন না ছাড়া, পথে ইঞ্জিন বিকল হওয়া, কামরায় গাদাগাদি করে যাতায়াত এবং শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় সুবিধার চরম ঘাটতিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ আগের মতোই বহাল রয়েছে।
প্রায় তিন দশক আগে বাণিজ্যিক দক্ষতা বাড়াতে এবং পরিচালন ব্যয় কমাতে কিছু ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এতে রেলওয়ের বার্ষিক আয় ১৬৫ শতাংশ বাড়লেও সেই বৃদ্ধির সুফল যাত্রীসেবায় কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ৩৪টি মেইল, এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন চলাচল করছে। তবে শুধু পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দেওয়াই যথেষ্ট নয়, এর জন্য কার্যকর তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তিতাস কমিউটারসহ বিভিন্ন ট্রেনে খাবার সরবরাহ না থাকা, ভাসমান বিক্রেতাদের উপদ্রব এবং শৌচাগারে পানির অভাব যাত্রীদের কষ্ট বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া অতিরিক্ত ও বেশি দামে টিকিট বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও পুরনো। অবশ্য যাত্রীদের এই দুর্ভোগ শুধু বেসরকারি ট্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলা ট্রেনগুলোতেও সময়সূচি বিপর্যয়, টিকিটের সংকট, লাইনচ্যুতি এবং কোচ ও ইঞ্জিনের ত্রুটি নিত্যদিনের ঘটনা। পুরনো রেলযান, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং রেলপথের সীমাবদ্ধতা সেবার মান উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেলওয়ের পরিচালন লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭২ কোটি ৫২ লাখ টাকায়। টিআইবির জরিপ অনুযায়ী, রেলসেবা নিতে গিয়ে ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছে, যা সুশাসন ও স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট করে। পাশাপাশি চুক্তি নবায়ন নিয়ে অনিয়ম ও আদালতের সাতটি মামলা রেলের অব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এরই মধ্যে ইঞ্জিন সংকটের কারণে ট্রেন বাতিল ও বিলম্বের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিটারগেজ ট্রেন বাতিল বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং বিলম্বে চলার সময় বেড়েছে ১৯৪ শতাংশ। একই সঙ্গে চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনা ৫২ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় পুরো ট্রেন পরিচালনায় মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
রেলওয়ের লক্ষ্য শুধু রাজস্ব বাড়ানো কিংবা লোকসানের অঙ্ক কমানো নয়; জনগণের অর্থে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত পরিবহন নিশ্চিত করা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনা হোক কিংবা সরকারি পরিচালনা- যে ব্যবস্থাই নেওয়া হোক, তার সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে হবে যাত্রীর স্বস্তি ও সন্তুষ্টি।
রেলসেবায় প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভাড়া দেওয়ার গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বুয়েট অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামানের মতে, বেসরকারি পরিচালকদের নিজস্ব রেলযান ও সরঞ্জামে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে চুক্তি নবায়নে স্বচ্ছতা আনয়ন, সুনির্দিষ্ট যাত্রীসেবার মানদণ্ড নির্ধারণ এবং তদারকি জোরদার করা অপরিহার্য। রেলের দীর্ঘমেয়াদি লোকসান রোধ ও যাত্রী দুর্ভোগ লাঘবে বহুমুখী সংস্কারের বিকল্প নেই।
