বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
দেড়শ বছরের ধর্মীয় সম্প্রীতি

ফেনীতে মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে মসজিদ-মন্দির

মুক্তবাণী রিপোর্ট

প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

ফেনীতে মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে মসজিদ-মন্দির

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির হিসেবে ফেনীতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে শহরের কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ ও শ্রী শ্রী জয় কালী মন্দির। যেখানে নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীরা নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করছেন। মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে একদিকে হিন্দুদের পূজা-অর্চনা, অন্যদিকে মুসলমানদের আজানের ধ্বনি। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার এই ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হয়ে আছে প্রায় দেড়শ বছর ধরে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ফেনী শহরের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের একপাশে মুসলমানদের ইবাদতস্থল ফেনী কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ, অন্যপাশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান জয় কালী মন্দির। মাঝে রয়েছে চলাচলের জন্য তাকিয়া রোড। মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে থাকা এ দুটি পৃথক ধর্মীয় উপাসনালয়ে যুগের পর যুগ ধরে স্বাভাবিক নিয়মে চলছে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। মসজিদে হচ্ছে আজান ও নামাজ, আর মন্দিরে চলছে পূজা-অর্চনা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৭৬ সাল থেকে পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয় এ মসজিদ ও মন্দির। বর্তমানে উক্ত জয় কালী মন্দিরে চলমান দুর্গোৎসবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা দিতে আসছেন এবং উৎসবের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন। আবহমানকাল থেকেই জেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে পূজা-পার্বণে অংশ নেন। মসজিদে নামাজের সময় হিন্দুরা নিজেরাই মন্দিরের ঢাক, উলুধ্বনি ও সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ রাখেন; ফলে মসজিদের মুসল্লিরা নিরবচ্ছিন্নভাবে নামাজ আদায় করতে কোনো সমস্যা হয় না।

মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি শাহজালাল ভূইয়া বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই ফেনী বড় মসজিদে নিয়মিত আজানের সঙ্গে যথাসময়ে মুসল্লীরা নামাজ আদায় আসছেন।

অপরদিকে পাশের জয় কালী মন্দিরে হিন্দুদের পূজা চলে আসছে। ‘আমাদের নামাজের সময় তারা সব বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখে, ফলে আমাদের ইবাদতে কোনো সমস্যা হয় না। এমনকি বিগত ২৪-র বন্যার সময় অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বী এই মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এটি আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি অনন্য নজির । প্রায় দেড়শ বছর ধরে দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি অবস্থান করলেও কখনও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শহরের গোড়াপত্তন থেকে আজ পর্যন্ত বড় মসজিদ ও জয় কালী মন্দির ঘিরে কোনো দাঙ্গা হয়নি; দুই ধর্মের মানুষের সম্পর্ক সবসময়ই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ।

এদিকে শ্রী শ্রী জয় কালী মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী তপন কুমার দাস বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই আমরা এই মন্দিরে পূজা করে আসছি। কয়েক গজের দূরত্বে পাশেই মুসলিমদের বড় জামে মসজিদ রয়েছে। আজানের সময় আমরা পূজার বাদ্যযন্ত্র ও সাউন্ড বন্ধ রাখি। এতে মুসলিম ভাইদের সঙ্গে আমাদের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে।বন্যার সময় আমাদের মসজিদে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি ভয়াল সেই দিনগুলোতে সেখান থেকে মন্দিরে থাকা হিন্দুদের জন্য খাবার পানিও সরবরাহ করা হয়েছিল। এটি আমাদের ফেনীর অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন।

ফেনী সদর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আমান উদ্দিন কায়সার সাব্বির জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই ফেনীতে একপাশে মসজিদ ও অন্যপাশে জয় কালী মন্দির অবস্থান করছে। স্ব-স্ব ধর্মের মানুষ এখানে শান্তিতে ইবাদত-বন্দেগি পালন করে আসছেন। উভয় ধর্মের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কখনো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বাক্যবিনিময়ও হয়নি; যা ফেনীর ধর্মীয় সম্প্রীতির এক চমৎকার উদাহরণ।

ফেনী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) সজল কান্তি দাশ জানান, দীর্ঘদিন ধরে দুটি সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন। এ নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো বিরোধের সৃষ্টি হয়নি। এটি নিঃসন্দেহে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন এবং বাঙালি সংস্কৃতির গর্বের বিষয়।

এম/আই

Link copied!