দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের সরকারবিরোধী হুতিবাহিনীর সংঘাত আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের উত্খাতকৃত সরকারকে পুনর্বহালে সৌদি আরবের তৎপরতার বিপরীতে হুতিরাও তাদের শক্তির জানান দিচ্ছে।
গত জুলাই মাসে হুতিবিরোধী তৎপরতার জবাবে তারা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা, তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরগুলোতে হামলার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় এর আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে তারা হামলা চালিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছে। সর্বশেষ সৌদির বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার পর সেখানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পর হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন যে সৌদিতে মানবিক ফ্লাইট চলাচল করতে পারবে, তবে সে ক্ষেত্রে ইয়েমেনের সানায় অবস্থিত মানবিক সহায়তা কেন্দ্রের অনুমতি নিতে হবে। হুতিদের এমন কঠোর তৎপরতার নেপথ্যে রয়েছে দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে ইয়েমেনের হুতি স্থাপনা লক্ষ্য করে সৌদির সহস্রাধিক বিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা।
এ ধরনের হামলায় যদিও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হুতি বিদ্রোহী হতাহত হয়েছে এবং তাদের স্থাপনার ক্ষতিসাধন হয়েছে, তবে একই সঙ্গে হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে হুতিরাও।
এর আগে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইলেও ট্রাম্প প্রশাসন এই মুহূর্তে নতুন করে এ ধরনের তৎপরতায় সম্পৃক্ত হতে চাইছে না, বরং এর বিপরীতে তারা হুতি কর্তৃক দখলকৃত বাব এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চাইছে। হুতিরাও বাব এল মান্দেব, মোখা বিমানবন্দর ও পেরিম দ্বীপ এরই মধ্যে নিজেদের দখলে নিলেও এর মধ্য দিয়ে অন্য কোনো দেশের ওপর লোহিত সাগর দিয়ে তেলবাহী বা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে জানান দিয়েছে যে সৌদি আরব ছাড়া সব দেশের জাহাজ চলাচলে তারা কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। যেহেতু ইরান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকেও হরমুজে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে—বিষয়টিকে মাথায় রেখে এর বিকল্প হিসেবে বাব এল মান্দেব দিয়ে সরবরাহ চ্যানেলটি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিই প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
হুতিবিরোধী অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংকটআরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বাজে অবস্থায় রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনের ফলাফলে সব সময় জনমত জরিপের প্রতিফলন না ঘটলেও এবার যদি সে রকমটা ঘটে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই কংগ্রেস ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে যাচ্ছেন ট্রাম্প। এমনটা হলে ভবিষ্যতে শুধু হুতিদের বিরুদ্ধেই নয়, চলমান ইরান যুদ্ধটাই চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। এমন অবস্থায় মধ্যবর্তী এই নির্বাচনের আগে ইরানে যেমন তিনি নতুন করে কোনো হামলা পরিচালনার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না, তেমনি হুতিদের বিরুদ্ধেও সৌদির অভিযানে সহায়তা করতে অনীহা প্রদর্শন করেছেন। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদীনের সুসম্পর্কের কারণে গোয়েন্দা ও স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে সহায়তার বিষয়টি অব্যাহত রয়েছে, যা সেখানে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষার জন্যও প্রয়োজনীয়।
এমন অবস্থাকে যে সৌদি আরব আগে থেকেই বিবেচনা করেনি, সেটি বলা যাবে না। আর তাই গত মাসে তারা তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মূলকথা হলো যেকোনো পক্ষ যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে এই চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যৌথভাবে সেই হামলা বা আক্রমণকে মোকাবেলা করবে। এই মক্কা চুক্তিকে অনেকেই ইসলামী ন্যাটো বলে অভিহিত করেছে, যদিও এতে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা অনেক কম এবং মুসলিম সব দেশকে এতে যোগদানের আমন্ত্রণটি উন্মুক্ত রাখা হয়নি, তবে কোনো কোনো দেশ নিজ থেকেই এতে যোগদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অনেকের ধারণা ছিল, এই চুক্তি স্বাক্ষরের কারণ ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা থেকে নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা। তবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের পরই আমরা দেখতে পেলাম যে সৌদি আরব ইয়েমেনের হুতিদের নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে সম্প্রতি ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে ইয়েমেন থেকে হুতিদের নির্মূল না করা পর্যন্ত সৌদি আরবের নেতৃত্বে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের হামলা অব্যাহত থাকবে।
আমরা যদি সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী অপারেশন এবং এর কার্যকারিতাকে বিশ্লেষণ করতে যাই, তাহলে দেখব যে এখানে দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি ঘটতে চলেছে। প্রথমত, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এই হামলার মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে হুতিরা পরাজিত ও নির্মূল হবে এবং সেখানে সৌদি সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালে ইয়েমেনের সরকার উত্খাতের পর থেকে হুতিরা যেভাবে এত দিন পর্যন্ত দেশটিতে তাদের প্রভাবকে সম্প্রসারিত করেছে, এই এক যুগ সময়ে এসে সৌদি আরব কিংবা তার মিত্রদের মাধ্যমে যদি তাদের উত্খাতের পরিকল্পনা করা হয়, সেটি বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ হবে না। এ লক্ষ্যে সৌদি আরব ও তার মক্কা চুক্তিভুক্ত মিত্ররা এক লাখ ইয়েমেনের নাগরিককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছে হুতিদের বিরুদ্ধে স্থল হামলা পরিচালনা করার জন্য, সঙ্গে রয়েছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর নিয়মিত ৪০ হাজার সেনা। এই এক লাখ ৪০ হাজার সেনা দিয়ে হুতিবাহিনীর সাড়ে তিন লাখ যোদ্ধাকে মোকাবেলা করা খুব সহজ কাজ নয়। এরই মধ্যে পাকিস্তান থেকে কয়েক হাজার সেনা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে, সঙ্গে কয়েকটি উড়োজাহাজে করে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে ইয়েমেনের বাহিনীর সহায়তায়। তুরস্কের সংসদে এখন পর্যন্ত মক্কা চুক্তি অনুমোদিত হয়নি, তবে তারা সৌদির সহায়তায় কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে। ফ্রান্স লোহিত সাগরের সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর রক্ষা এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তায় সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এতসব আয়োজনের পরও যে বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা থেকে যায় তা হলো, এই হামলা কত দিন পর্যন্ত চলবে, তা নিশ্চিত নয় এবং দীর্ঘস্থায়ী হলে সে ক্ষেত্রে যে স্থল বাহিনী নিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার কথা ভাবা হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে তাদের প্রস্তুতি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আর নিঃসন্দেহে এ ক্ষেত্রে সফল হতে হলে ইয়েমেনের ভেতরের নিজস্ব বাহিনীর সক্ষমতা একটি পূর্বশর্ত। এদিক দিয়ে হুতিরা অনেকটাই অগ্রগামী অবস্থায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি এই অভিযান ব্যর্থ হয়, তাহলে গোটা ইয়েমেন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি থেকে যায়।
দুই কোটিরও অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত ইয়েমেনে প্রায় অর্ধেক শিয়া ধর্মালম্বী এবং হুতিরা শিয়া মুসলমান সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। উত্তর ইয়েমেনের শিয়া আলেম বদর উদ্দিন আল হুতির নাম অনুসারে এই প্রতিরোধ আন্দোলনের নামকরণ হয়েছে। বদর উদ্দিন আল হুতির এক ছেলে হোসেন আল হুতি সরকারি বাহিনীর হাতে এর আগেই নিহত হয়েছেন। অপর ছেলে আবদুল মালিক আল হুতি বর্তমানে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বলা যায়, সৌদি আরবের হস্তক্ষেপের ফলেই হুতি বিদ্রোহীদের পক্ষে ইরানের কাছ থেকে একরকম প্রত্যক্ষ সহযোগিতাপ্রাপ্তির ফলে এর আগে দেশটির উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ লাভের পর বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে হুতি যোদ্ধারা। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো এবং তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ক্রমাগত বিমান ও ড্রোন হামলা এবং ইরানের সহায়তায় হুতিদের পাল্টা প্রতিরোধ (যদিও এখন দাবি করছে, তারা তাদের নিজেদের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করছে) সেখানে চরম মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনার পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয় এবং বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে এই যুদ্ধ ইয়েমেনের সীমানা অতিক্রম করার সম্ভাবনা কম নয়, যা এরই মধ্যে লোহিত সাগরে তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে। সংকট সমাধানে যেখানে আরব জোট হামলাকেই একমাত্র উপায় হিসেবে দেখছে, সেখানে হুতিরাও আত্মরক্ষাকে অবলম্বন করে পাল্টা হামলাকেই বেছে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আলোচনাকে সমাধানের পথ হিসেবে বেছে নিতে যত দেরি হবে, সংকট ততই ঘনীভূত ও দীর্ঘায়িত হবে, সেই সঙ্গে গাজা ও ইরান সংকটের সঙ্গে একটি নতুন সংকট যুক্ত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে আরো অস্থির করে তুলবে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
